ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় বৈশ্বিক শেয়ারবাজার। এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর বেশির ভাগ সূচক গতকাল ছিল বাড়তির দিকে। একই প্রবণতা দেখা গেছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারেও। খবর এপি ও রয়টার্স।
বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বর্তমানে বড় প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ। রোববার রাতে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা। বিষয়টি দেশটির পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের কাছে মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। ফলে জাপানি শেয়ারবাজার সূচকগুলো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার পথে তা খুব একটা বাধা হয়ে ওঠেনি।
যদিও জাপানি অর্থনীতি এখনো অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কারণ ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে (এলডিপি) নতুন প্রধানমন্ত্রী পেতে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। অন্যদিকে উত্তরসূরি নির্বাচিত হয়ে সংসদীয় অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবেন শিগেরু ইশিবা।
জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক গতকাল বেড়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে দশমিক ৫ শতাংশ। দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক। এছাড়া হংকংয়ের হ্যাং সেন সূচক বেড়েছে দশমিক ৯ শতাংশ। তবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ কমেছে দশমিক ২ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জাপানি শেয়ারবাজারে দেশটির রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পরিবর্তে অর্থনৈতিক সূচকগুলোরই প্রভাব দেখা গেছে বেশি। গতকাল জাপানের মন্ত্রিপরিষদ দপ্তর জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) দেশটির অর্থনীতি পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বার্ষিক হিসেবে মৌসুমি সমন্বিত প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে পূর্বাভাস ছিল ১ শতাংশ। এতে ভূমিকা রেখেছে ভোক্তা ব্যয় ও মজুদ বৃদ্ধি।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের বাণিজ্যচুক্তিও এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। এতে গতকাল জাপানি গাড়ি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রমুখী জাপানি গাড়ির ওপর শুল্ক আগের ২ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হলেও তা শুরুতে ঘোষিত ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে অনেক কম। গতকাল টয়োটা ও নিশানের শেয়ারদর বেড়েছে যথাক্রমে দশমিক ৩ ও ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে মিৎসুবিশি ও সুবারুর শেয়ারদর বেড়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ২ ও ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আমোভা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বৈশ্বিক কৌশলবিদ নাওমি ফিঙ্কের মতে, জাপানের নেতৃত্বের সাময়িক অনিশ্চয়তায় বাজারে স্বল্পমেয়াদে হয়তো কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। তবে সেটিও নতুন নেতা নির্বাচন হলে কাটিয়ে উঠবে। এছাড়া এলডিপির সংখ্যালঘু নেতৃত্বের অবস্থান শিগগিরই বদলানোর সম্ভাবনা নেই, তাই নীতিনির্ধারণে সমঝোতাই মুখ্য ভূমিকা রাখবে।
এদিকে তিন বছরের মধ্যে পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে ফ্রান্সে। গতকাল আস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বায়ারু। গত মাসেই ফ্রাঁসোয়া বায়ারু আস্থা ভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন। এরপর ফরাসি সম্পদের বাজারে বিক্রয়চাপ কমে যায়। ফরাসি শেয়ার ও বন্ডগুলো গতকালের বাজারে ইউরোপীয় সমকক্ষদের তুলনায় কিছুটা ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।
দিনব্যাপী লেনদেনের শুরুতে গতকাল ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক বেড়েছে প্রায় দশমিক ২ শতাংশ। ইউরোপের অন্যান্য বাজারের মধ্যে জার্মানিতে এদিন ডিএএক্স সূচক বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। ঊর্ধ্বমুখিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে মার্কিন শেয়ারবাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রের ডাও ফিউচারস ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচারস বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ হারে।
ফ্রান্স ও জাপানের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখন ডলারের বিনিময় হারেও প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
চলতি মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) ২৫ বেসিস পয়েন্ট হারে সুদহার কমাবে বলে বাজারে প্রত্যাশা ক্রমেই বাড়ছে। তবে সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন খুব কমসংখ্যক বিশ্লেষক।
এইচএসবিসির গ্লোবাল ফরেক্স রিসার্চ প্রধান পল ম্যাকেলের মতে, মার্কিন কর্মসংস্থান বাজার ও সুদহারের কাটছাঁটের সম্ভাবনা মিলিয়ে ডলারের বিনিময় হারে দুর্বলতা দেখা যেতে পারে। কিন্তু ইয়েন ও ইউরোর ওপর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব অন্য মুদ্রার তুলনায় ডলারের ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে।
মার্কিন কর্মসংস্থান তথ্য প্রকাশের পর গত শুক্রবার অন্য প্রধান মুদ্রাগুলোর তুলনায় ছয় সপ্তাহের মধ্যে নিচের স্থানে পৌঁছেছে ডলার। মুদ্রাবাজারে গতকাল সুইস ফ্রাঁ এবং অস্ট্রেলিয়ান ও নিউজিল্যান্ড ডলারের তুলনায় মার্কিন ডলার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দুর্বলতা দেখিয়েছে। প্রতি ইউরোর বিনিময় হার দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১ ডলার ১৭ সেন্টে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ইয়েনের তুলনায় কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে ডলার। এদিন জাপানি মুদ্রার বিপরীতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১৪৭ দশমিক ৬ ইয়েন।
এর আগে শুক্রবার মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড দ্রুত কমলেও গতকাল কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড সামান্য কমে হয়েছে ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। অন্যদিকে সুদহার সংবেদনশীল দুই বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ছিল ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ।